রাষ্ট্র সম্পর্কে গান্ধীজির ধারণার চারটি বৈশিষ্ট্য লেখ Write four characteristics of Gandhiji's idea of ​​the state

রাষ্ট্র সম্পর্কে গান্ধীজির ধারণার চারটি বৈশিষ্ট্য লেখ
রাষ্ট্র সম্পর্কে গান্ধীজির ধারণার চারটি বৈশিষ্ট্য লেখ


প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হেগেল, মিল, বেন্থামদের ন্যায় গান্ধীজি তথা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী কোন সুনির্দিষ্ট ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক তত্ত্ব যা প্রকৃত প্রস্তাবে 'গান্ধীবাদ নামে কোন রাজনৈতিক দর্শন বলে অভিহিত করা যায়-তা করেন নাই। গান্ধীজির নিজের কথায়, “গান্ধীবাদ বলে কিছু নেই-নতুন কোন নীতি বা মতবাদের স্রষ্টা হিসাবে আমি দাবি করি না। প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যাদির ক্ষেত্রে আমি কেবল শাশ্বত সত্যকে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি। একে গান্ধীবাদ বলা যায় না। এর মধ্যে কোন মতবাদ নাই"। তথাপি গান্ধীজি পরবর্তী সময়ে তাঁর অনুগামীরা তাঁর লেখাগুলি সংকলিত করে 'গান্ধীবাদ' নামক রাজনৈতিক দর্শন প্রচার করেন।

গান্ধীজির চিন্তাধারার উৎস অনুসন্ধানে উল্লেখিত যে, তিনি বেদ, ভাগবত গীতা, বাইবেল, কোরান, প্রভৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাছাড়াও তাঁর চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছিল বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম। গান্ধীজির রাষ্ট্রচিন্তায় টলস্টয়ের "The kingdom of God is within you", থেরোর "Essay on civil Disobedience" এর দ্বারা প্রভাবিত হন। তৎসহ জন রাস্কিনের "Unto This Last" গান্ধীজিকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিল। এরূপ প্রেক্ষাপটে গান্ধীজির রাষ্ট্রচিন্তার বৈশিষ্ট্যগুলি হল:

(i) সত্য ও অহিংসার পূজারী গান্ধীজি মনে করতেন, বলপ্রয়োগই হল আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। হিংসা ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্র তাঁর অস্তিত্ব বজায় রাখে। তাঁর মতে, "রাষ্ট্র হোল সংগঠিত ও কেন্দ্রীভূত হিংসার প্রতীক। ব্যক্তি মানুষের আত্মা থাকলেও রাষ্ট্র আত্মাহীন যন্ত্র।" তাঁর বক্তব্যে আরো জানা যায় যে, নিজেদের প্রয়োজনে রাষ্ট্র হিংসাত্মক পথ অবলম্বন করে। রাষ্ট্রের এই হিংসাত্মক কাজকে গান্ধীজি পাশবিক কাজ বলে অভিহিত করেছেন। 

(ii) গান্ধীজি মনে করতেন মানুষের ব্যক্তিত্বই তাঁর অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি। তাই রাষ্ট্রের
অক্ষেত্রকে সীমিত করা আবশ্যিক। থেরোর ন্যায় তাঁর বক্তব্য সেই রাষ্ট্র তত ভালো মিষ্টি হয় তবে ফলগুলি মিষ্টি হতে বাধ্য।" 

(iii) রাষ্ট্রের পরিবর্তে সামাজিক সংগঠনগুলির যে রাষ্ট্র যতকম শাসন করে। গান্ধীজির মতে, "মানুষই শেকড় রাষ্ট্র ফলমাত্র। শেকড়টি উপর একাধিক কর্ম সম্পাদনের দায়িত্ব অর্পণের পক্ষপাতী ছিলেন গান্ধীজি। তিনি মনে করতেন এমন অনেক কাজ আছে যা রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া সম্পাদন করা সম্ভব নয় কেবল সেই কাজগুলি রাষ্ট্র করবে বাকি সকল কাজ সামাজিক সংগঠনগুলির দ্বারা সম্পাদিত হবে।

(iv) গান্ধীজি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কেন্দ্রীভবনের চরম বিরোধী ছিলেন। ভারতের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র সম্পর্কে তার ভাবনা ছিল রামরাজ্য ও সমাজতান্ত্রিক। মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের ন্যায় গান্ধীজির সমাজতন্ত্র বিপ্লবের পথে আসবে না। গান্ধীজির ভাবনা পুঁজিপতিরা স্বেচ্ছায় শোষণ ও পীড়নের পথ পরিত্যাগ করবে প্রত্যেকে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও আদর্শ ইত্যাদির দ্বারা পরিচালিত হয়ে আদর্শ সমাজ যেখানে শোষণ ও বৈষম্য থাকবে না এরূপ সমাজ গড়ে তুলবে। তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

গান্ধীজি কি নৈরাজ্যবাদী ছিলেন? গান্ধীজির রাষ্ট্রহীন সমাজের নাম কি?

উত্তর  সাধারণভাবে নৈরাজ্যবাদ বলতে অক্সফোর্ড এর অভিধান অনুযায়ী "পীড়নমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে অপসারিত করে সমাজের পূর্নগঠনকে নৈরাজ্যবাদ বলে"। এই তত্ত্ব অনুয়াযী মানুষের স্বাভাবিক ও সাবলীল জীবন যাপন করার জন্য কোন প্রকার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্রে প্রয়োজন নাই। নৈরাজ্যবাদীদের মধ্যে ক্রোপ্ট কিন-এর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নৈরাজ্যবাদীরা মনে করেন। প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার অপ্রয়োজনীয় এবং প্রকৃত অর্থে অ-প্রতিনিধিমূলক। নৈরাজ্যবাদীরা আরও বিশ্বাস করেন যে, Power corrupts, and absolute power corrupts absolutely.

নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কিত এরূপ প্রেক্ষাপটে টলস্টয়ের দ্বারা প্রভাবিত গান্ধীজীকে নৈরাজ্যবাদী বলা যাবে কিনা তা নিয়ে চিন্তাবিদদের মধ্যে ভিন্ন মত দেখা যায়।

(1) গান্ধীজীকে দার্শনিক নৈরাজ্যবাদী (Philosophical anarchist) বলে যারা উল্লেখ করেন তাদের মধ্যে গোপীনাথ ধাওয়ান, বিনয়কুমার সরকার, অতীন্দ্রনাথ বসু প্রমুখদের নাম উল্লেখযোগ্য। ধাওয়ানের মতে, গান্ধীজী সকলের সর্বাধিক কল্যাণ সাধনের কামনা করেছিলেন। গান্ধীজী মনে করতেন, কেবল অহিংস স্বয়ং সম্পূর্ণ গ্রাম জীবনের ভিত্তিতে শ্রেণীবিহীন রাষ্ট্রহীন গণতন্ত্রের নির্মাণ সম্ভব। বিনয় সরকারের মতে, গান্ধীজীর সাথে টলস্টয়ের সাদৃশ্যতা পরিলক্ষিত হয়। 

(ii) অবশ্য জর্জ উডকর্ক প্রমুখরা মনে করেন, গান্ধীজী ঘীয় নৈরাজ্যবাদী। 

(iii) তবে ফিলিপ স্প্র্যাট, বিমানবিহারী মজুমদার, পল পাওয়ার প্রমুখরা গান্ধীজীকে সরাসরি নৈরাজ্যবাদী বলতে সম্মত নয়। পাওয়ারের মতে, গান্ধীজী টলস্টয়ের শায় বাস্তবক্ষেত্রে রাষ্ট্রহীন সমাজ চাননি। বিমানবিহারী মজুদারের মতে, গান্ধীজি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও কখনোই তিনি রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার কথা বলেননি।

ডঃ কুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতে, গান্ধীজির একটি আদর্শবাদী দার্শনিক সত্তা ছিল। তিনি এজন্য জ্ঞানদীপ্ত নৈরাজ্যবাদের পাশাপাশি চিন্তা করতেন স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। অধ্যাপক ভট্টাচার্যের মতে, গান্ধীজীর চিন্তাধারাকে 'দার্শনিক নৈরাজ্যবাদী' বলা যায়।

সবশেষে বলা যায়, ক্রোপ্টকিন কিংবা গান্ধীজী এঁদের সকলের মহৎ উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের সমকালীন সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা ও জটিলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটি বিকল্প সমাজ ব্যবস্থার সন্ধান দেওয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ