হেগেলের বিশেষত: হেগেলের সমকালীন রাষ্ট্রচর্চায় বিশেষের উপর গুরুত্ব দেওয়া হত কিন্তু হেগেল অধিবিদ্যাগত দিক থেকে প্রচলিত বিশেষ (particular) এর গুরুত্বহীনং প্রতিষ্ঠার প্রয়াস করেন। তৎসহ প্রমাণ করলেন বিশেষ তখনই গুরুত্ব পাবে যখন তা সমগ্রের মধ্যেই অন্তনিহিত হবে। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী বাস্তব, বৈধ, যুক্তিসিদ্ধ সমূহের প্রতীক হল সমগ্র। স্বভাবতই হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্ব মানুষের সমগ্রজীবন ও জগৎ সম্পর্কে ব্যাপক দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। হেগেলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মানুষ ও তার অভিজ্ঞতাজাত বিশ্ব-এই দুটির সমন্বয়ে একটি সুসংহত সমগ্র। এই সমগ্রটি কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়-সংবেদনে অনুভূত জগৎ সম্পর্কে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। এই সুসংহত সমগ্র তথা কথিত অভিজ্ঞতাজাত জ্ঞানের উর্দ্ধে অধিবিদ্যক দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা বোঝা সম্ভব।
মূল বক্তব্য:
(১) হেগেলের অধিবিদ্যক দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী জ্ঞাত বিষয় সমূহের মধ্যে অনতিক্রম্য বিরোধ রয়েছে এমন ভাবনা সঠিক নয়। জ্ঞাতা বা বিষয়ী এবং জ্ঞেয় বা বিষয়ের মূলবস্তু, থট ও রিয়ালিটি পারস্পরিক বৈপরীত্য লুপ্ত হয়ে ভাব বা স্পিরিট এর মাধ্যমে যে তাদাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত করে তা বিষয় ও বিষয়ীর মধ্যস্থিত যাবতীয় বৈরিতার মাধ্যমে উভয়ের মধ্যে প্রকৃত ঐক্য ও বিশ্বজনীনতায় রূপান্তরিত করে।
(২) আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মূর্ত বিশেষ সমূহ বা সত্য বা রিয়াল বলে দৃশ্যমান তা রিয়াল তা সত্য নয়। হেগেল উল্লেখ করেন বস্তুর অস্তিত্ব (existence) ও বস্তুর মৌলসভা (essence) এর মধ্যে ভিন্নতা বর্তমান। যখন মৌল সত্তা পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধ হয় তখন বিচ্ছিন্ন বস্তুমাত্র না থেকে তা পরম বা পূর্ণ সত্য (রিয়ালিটি) থেকে সমগ্রতা ও ঐক্যতায় রূপান্তরিত হয়।
হেগেল আরো উল্লেখ করেন যা রিয়াল বা সত্য তা র্যাশনাল বা যুক্তিসিদ্ধ এবং যা যুক্তিসিদ্ধ তা সত্য। এদিক বলা যায় বাস্তবে অস্থিত্ব থাকলেও যদি যুক্তিসিদ্ধ না হয় তবে তা সত্য নয়। যুক্তিসিদ্ধ অর্থে যা পুণঃ সৃষ্টিতে সক্ষম। জ্ঞানের পূর্ণতায় সত্যের প্রকৃত রূপ উদ্ভত হয়। এই জ্ঞানের মাধ্যমে ভাব বা রীজন আত্মসচেতন হয়ে ওঠে সে নিজেই যাবতীয় বিষয়ের মূল বস্তু বা এসেন্স। অর্থাৎ সত্য কে জানা বলতে নিজেকে জানা। হেগেলের ব্যাখ্যায় আত্ম সচেতনা যা বাস্তবে আত্মনিন্ত্রণের দ্যোতক এবং এটিই স্বাধীন অবস্থার সূচক স্বরূপ।
(২) আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মূর্ত বিশেষ সমূহ বা সত্য বা রিয়াল বলে দৃশ্যমান তা রিয়াল তা সত্য নয়। হেগেল উল্লেখ করেন বস্তুর অস্তিত্ব (existence) ও বস্তুর মৌলসভা (essence) এর মধ্যে ভিন্নতা বর্তমান। যখন মৌল সত্তা পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধ হয় তখন বিচ্ছিন্ন বস্তুমাত্র না থেকে তা পরম বা পূর্ণ সত্য (রিয়ালিটি) থেকে সমগ্রতা ও ঐক্যতায় রূপান্তরিত হয়।
হেগেল আরো উল্লেখ করেন যা রিয়াল বা সত্য তা র্যাশনাল বা যুক্তিসিদ্ধ এবং যা যুক্তিসিদ্ধ তা সত্য। এদিক বলা যায় বাস্তবে অস্থিত্ব থাকলেও যদি যুক্তিসিদ্ধ না হয় তবে তা সত্য নয়। যুক্তিসিদ্ধ অর্থে যা পুণঃ সৃষ্টিতে সক্ষম। জ্ঞানের পূর্ণতায় সত্যের প্রকৃত রূপ উদ্ভত হয়। এই জ্ঞানের মাধ্যমে ভাব বা রীজন আত্মসচেতন হয়ে ওঠে সে নিজেই যাবতীয় বিষয়ের মূল বস্তু বা এসেন্স। অর্থাৎ সত্য কে জানা বলতে নিজেকে জানা। হেগেলের ব্যাখ্যায় আত্ম সচেতনা যা বাস্তবে আত্মনিন্ত্রণের দ্যোতক এবং এটিই স্বাধীন অবস্থার সূচক স্বরূপ।
(৩) হেগেলের মতে, মনের মৌলিক বিষয় হল স্বাধীনতা সত্য কেবল যুক্তিভিত্তি নয় তা স্বাধীনও বটে।
(৪) হেগেলের বিখ্যাত ডায়ালেকটিক সূত্র অনুযায়ী কোন বিষয় যথার্থ জানতে হলে তার অন্তঃসার ও আপাতঃ বাহ্য অস্তিত্ব উভয় পরস্পর বৈরীতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। কোন বিষয় তার প্রকৃত রূপ ও অন্তবস্তু, উভয়ের মাধ্যমেই যথার্থ প্রকাশ পায়। পরস্পর বিপরীতের অভিন্নতায় থাকে উভয়ের অর্ন্তবস্তুর উন্নততর অবস্থান। বাদ এর জন্য প্রতিবাদ আবার এই প্রতিবাদ ধাবিত হয় সম্বাদে এই সম্বাদে জন্ম হয় বাদ এভাবেই দ্বান্দিক ক্রিয়া পূর্ণতার অন্তিম স্তরে এগিয়ে চলে।
(৫) হেগেল পরম্পরাগত ন্যায়শাস্ত্রের পরিবর্তে ন্যায় শাস্ত্র সম্পর্কে নতুন ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করেন। পরম্পরাগত ন্যায় শাস্ত্র বিশ্লেষাত্মক যা তথাকথিত বৈপীরত্যের সূত্রের সাহায্যে অভেদের সূত্র (law of identification) প্রতিষ্ঠা করে। হেগেলের দ্বন্দুবাদ সশ্লেষাত্মক ন্যায় শাস্ত্রের ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করে। এই দ্বন্দুবাদ অনুযায়ী কোন বিষয় একই সাথে থাকা এবং না থাকা-দুই সম্ভব।
রাষ্ট্রসম্পর্কিত ব্যাখ্যা: এই দৃষ্টিতে হেগেল রাষ্ট্রের চরম চূড়ান্ত গুরুত্বের প্রতি মতামত প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসকারী বহুমুখী স্বার্থের ভিন্নতায় রাষ্ট্র সুসংহত সামগ্রিকতার প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। হেগেলের মত অনুযায়ী যেক্ষেত্রে আত্মসচেতন ভাব (Reason এর কর্মকান্ড মূর্ত হয় সংশ্লিষ্ট সামগ্রিকই বাস্তব (Real) এবং যুক্তিসিদ্ধ (rational) তাই রাষ্ট্রে নগরিকদের পারস্পরিক বিবাদমান স্বার্থের মধ্যেও ঐক্য ও সামগ্রিকতার প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হয়। ব্যক্তির বিশেষ স্বার্থ ও ভূমিকা রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তনিহিত ভাব এর দ্বারা একত্রিত হয়ে নূতন একপ্রকার ঐক্য সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র 'ভাব' এর অর্জনের প্রতিনিধিত্ব করে। এইভা স্বনিয়ন্ত্রিত এবং নিজের মধ্যেই তা নিহিত তাই ভাব স্বাধীন। হেগেল উল্লেখ করেন, পরিবা এর মধ্য দিয়ে ভাব প্রথম আত্মজ্ঞানের দিকে অগ্রসর হয়।
পরিবারের মধ্যে যুক্তি সিদ্ধ ভালবাস প্রতীমূর্ত হয় তাই এই পরিবার প্রথম অবস্থায় বাদ বা Thesis বিচিত্র বহুমুখী প্রয়োজন মেটাল পরিবারের দুর্বলতা থেকে পুর সমাজের উদ্ভব হল। এই পুরসমাজ অ্যান্টি থিসিস (antithes বা প্রতিবাদ। তথাপি ব্যক্তিমানুষের অধিকতর চাহিদার পূরণ সম্ভব হলেও ব্যক্তি স্বাে প্রতিদ্বন্দিতার ফলে পরসমাজগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ফলত সৃষ্টি হল (Synthesis) বা স হিসেবে রাষ্ট্র। পরিবার ও পুর সমাজের মিলিত অথচ উভয়ের উচ্চতর পূর্ণতর এবং সমগ্র- প্রকাশ রাষ্ট্র।
হেগেলের মতে, রাষ্ট্রের মধ্যেই চূড়ান্ত ভাব মূর্ত হয়। এবং তা আত্মসচেতন ফলত পরিপূর্ণরূপে স্বাধীন। তাই রাষ্ট সার্বজনীন যা তার যুক্তিগ্রাহ্যতা প্রকাশ করে এবং ত ব্যক্তিকে যুক্ত হতে সক্ষম করে। হেগেল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পরম বা পূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তাঁর মতে, এই সার্বভৌমত্ব অখন্ড এমন কি নৈতিকতার দ্বারা ইহা অবিভাজ্য। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পরম ও পূর্ণ। এক্ষেত্রে হেগেল রাষ্ট্র স্বাধ বিঘ্ন হলে যুদ্ধকেও সমর্থন করেছেন।
হেগেল রাষ্ট্রের প্রতি জনগনের কর্তব্য উল্লেখ করেছে। তাঁর মতে জনগণের মৌলিক কর্তব রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আত্মনিবেদন। ব্যক্তি মানুষ একমাত্র রাষ্ট্রীয় জীবনে 'যুক্তিবোধ (Rational) হিসেবে থাকতে পারে। হেগেলের মতে ব্যক্তি রাষ্ট্রের প্রতি আত্মসমর্পণ করলে আপাতদৃষ্টিতে তার স্বাধীনতা লঘু হচ্ছে মনে হতে পারে তবে তার আসল স্বাধীনতা সফল ভাবে অর্জনের পথ সুদৃঢ় হয়।
দুর্বলতা ও গুরুত্ব: সমালোচকদের মতে, হেগেলের রাষ্ট্র দর্শন রাষ্ট্রকে চরম ক্ষমতার অধিকারী করেছে এবং ব্যক্তি কে তুচ্ছ করেছেন। তবে সমসাময়িক সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত শ্রেণীগুলির কার্যকারীতা উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তার রাষ্ট্র দর্শনের মূল্যায়ন তাঁর সমকালীন সমাজের কার্যকারীতার ভিত্তিতে করা যথোপযুক্ত।
উপসংহার: সর্বপরি বলা যায়, হেগেল মানবিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে সামগ্রিকতার গুরুত্ব প্রদানের জন্য চিন্তা ও বাস্তবতার মধ্যে মৌলিক অভেদ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হন। তাঁর ডায়ালেকটিস কোন বিষয়কে আত্ম অস্বীকৃতির মাধ্যমে সবশেষে সংশ্লেষাত্মক এক সামগ্রিকতায় প্রকাশ করে।
উপসংহার: সর্বপরি বলা যায়, হেগেল মানবিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে সামগ্রিকতার গুরুত্ব প্রদানের জন্য চিন্তা ও বাস্তবতার মধ্যে মৌলিক অভেদ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হন। তাঁর ডায়ালেকটিস কোন বিষয়কে আত্ম অস্বীকৃতির মাধ্যমে সবশেষে সংশ্লেষাত্মক এক সামগ্রিকতায় প্রকাশ করে।
.jpg)
0 মন্তব্যসমূহ