সপ্তদশ শতকে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তার জগতে যে সকল চিন্তাবিদ জড়বাদী দর্শনের ভিত্তির উপর নির্ভর করে নিজ নিজ মতামত ব্যাখ্যা করেন তাঁদের মধ্যে জন লক অন্যতম। রাষ্ট্রনীতি চর্চাকে তিনি দেবতত্ত্ব ও অধিবিদ্যা থেকে মুক্ত করে ইন্দ্রিয় সমূহের অভিজ্ঞতা ভিত্তিক আলোচনা করেন। হবসের জড়বাদী ও পার্থিব দৃষ্টিভঙ্গির ঐতিহ্য অনুসরণ করে লক তার রাষ্ট্রনীতি চর্চা প্রকাশ করেন।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাণপুরুষ ও রাজনৈতিক উদারবাদের জনক লক 'টুট্রিটজ অন সিভিল গর্ভনমেন্ট' গ্রন্থে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেন। উদারনীতিবাদের পথ প্রদর্শক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী লক প্রথম ব্যক্তি মানুষের অধিকারের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনে গুরুত্ব আরোপ করেন। লকের রাষ্ট্রতত্ত্ব ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য মর্যাদা অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি দেয়।
উদারনীতিবাদের অন্যতম ভিত্তি হল ব্যক্তি স্বাধীনতার স্বীকৃতি। লকের রাষ্ট্রচিন্তায় ব্যক্তি স্বাধীনতা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যায়। তাঁর মতে মানুষের জন্মগত ও স্বাভাবিক অধিকার হল স্বাধীনতা। লক মানুষের স্বাধীনতা সুরক্ষায় বিশেষ যত্নশীল ছিলেন। উদারবাদের অন্যতম নীতি জনগণের মতামতের উপর গুরুত্ব প্রদান। লকের সামাজিক সম্মতি ব্যাখ্যা জনগণের মতামতকে গুরুত্ব প্রদান করে। তাঁর নিকট রাষ্ট্র শক্তির মূল উৎস জন সম্মতি।
লকের সম্পত্তি বিষয়ক ব্যাখ্যায় উল্লিখিত যে ব্যক্তির সম্মতি ব্যতীত রাষ্ট্রীয় শক্তি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। জনগণের প্রতি কর আরোপের ক্ষেত্রেও জনপ্রতিনিধির সম্মতির উপর নির্ভরশীলতার কথা বলেন লক। লকের ব্যাখ্যায় রাষ্ট্র ব্যক্তিগত মালিকানার সম্পত্তি সুরক্ষার অতন্ত্রপ্রহরী। তাঁর মতে ব্যক্তি সম্পত্তি সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যর্থ হলে জনগণ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে। জনগণের বিদ্রোহ ঘোষণার অধিকার উদারবাদের সুদৃঢ় ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রসঙ্গত উদারবাদ সংস্কারমূলক পদ্ধতিতেই পরিবর্তন সাধন করার পক্ষপাতী।
প্রচলিত ব্যবস্থা ও কাঠামোর মধ্যেই পরিমিত সংস্কার সাধন উদারনীতিবাদের প্রধান নীতি। সর্বপরি বলা যায়, লক ব্যক্তির স্বাধীনতা ও একের স্বাধীনতা যাতে অন্যের স্বাধীনতার বাধা না হয় তার জন্য রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় আইনের সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রচলিত কাঠামোয় চলমান ব্যবস্থার মধ্যেই সংস্কার সাধন হল উদারবাদের মৌলিক নীতি। যা লক তার বিভিন্ন আলোচনায় বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন। তাই তাঁকে উদারবাদের জনক বলা হয়।
1) 'সকলের ইচ্ছা' ও 'সাধারণের ইচ্ছা'র মধ্য পার্থক্য করা যায় কিভাবে?
উঃ রুশো সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে মানবগোষ্ঠির প্রকৃতির রাজত্বে ভোগ করা প্রাকৃতিক অধিকার সমূহ সামগ্রিক ভাবে সমাজের নিকট সমর্পণ করে যে সমাজ ব্যক্তির নিজের ও অন্যের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। এই ভাবে মানুষ নিজেকে সকলের নিকট সমর্পণ করে কোন এককের নিকট নয়। সমাজ তখন সাধারণের ইচ্ছারই প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। সাধারণের ইচ্ছা লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, মৌলিকতার দিক থেকে সকলের প্রতি প্রযোজ্য। অন্যদিকে সকলের ব্যক্তিগত স্বার্থ অভিমুখী মানুষের আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক নির্দিষ্ট ইচ্ছার যোগফল।
2) রুশোর-র 'সাধারণ ইচ্ছা' ধারনাটির অন্তনির্হিত নির্যাস কি?
উঃ রুশোর 'সাধারণ ইচ্ছা' ধারনাটির অন্তর্নিহিত নির্যাস হল এই ইচ্ছার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মৌলিকতা সাধারণের ভালোর দিক, ইহার উদ্ভব সকল ব্যক্তি থেকে আবার সকলের ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য। ব্যক্তি মানুষ নিজের ভালকে সাধারণের মঙ্গল অভিমুখী করে তুলবে। রুশো মানুষের ভেতরে থাকা বিশুদ্ধ শুভ অভীপ্সা কে সার্বভৌম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তার বর্হিপ্রকাশের নামকরণ করেছেন "সাধারণের ইচ্ছা"।
3) 'সর্বগ্রাসী গণতন্ত্র' এর স্রষ্টা কাকে বলা হয়?
উঃ জাঁ জাক রুশোকে 'সর্বগ্রাসী গণতন্ত্র' এর স্রষ্টা বলা হয়।
4) রুশোর ধারনায় স্বাভাবিক মানুষ কীরূপ?
উঃ রুশোর ধারনা স্বাভাবিক মানুষ সমাজের বাইরে অবস্থানকারী বিচ্ছিন্ন মানুষ। কোনপ্রকার প্রজ্ঞাহীন ও সহজপ্রবৃত্তি অবলম্বন কর বেঁচে থাকার জন্য।
5) রুশোর মতে মানব জাতির ইতিহাসে কোন সময়টা দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বাধিক সুখী সময়?
উঃ রুশোর মতে মানব সমাজের প্রথম পর্বে যখন মানুষ গাছের বা মাছের কাঁটা দিয়ে পশুর চামড়ার পোশাক বানাতো, পশুর পালক ও ঝিনুক গহনা পরে নিজেদের সাজাতো, নানা রঙ দিয়ে নিজেদের শরীর, রাঙাতো একথায় যতদিন মানুষ নিজেদের সাধ্যমত শ্রম দিয়ে সুখস্বাচ্ছন্দ্যে থেকে যতটা প্রকৃতিগত ভাবে তাদের পক্ষে সম্ভব এবং নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা লঙ্ঘন না করে আদান-প্রদানের আনন্দ ভোগ করেছে-এই সময়টা দীর্ঘ সময় ও সর্বাধিক সুখী সময় অতিবাহিত হয়েছে?
7) রুশো কীরূপ জ্ঞান ও শিল্পকলাকে অগ্রহণীয় ও দুষ্ট বলে ব্যাখ্যা করেছেন?
উঃ রুশোর মতে যে জ্ঞান ও শিল্প কলা সমতা বিনষ্ট করে সম্পত্তি ও শ্রমকে আবশ্যক করে তোলে, অরণ্যের পরিবর্তে ক্ষেত তৈরি করে রোপিত হয় এবং দাসত্ব ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি করে সেইরূপ জ্ঞান ও শিল্প কলাকে রুশো দুষ্ট ও অগ্রহণীয় বলে ব্যাখ্যা করেন।
8) রুশোর মতে অসাম্য উদ্ভবের প্রথম পর্যায় কি?
রুশোর মতে অসাম্য উদ্ভবের প্রথম পর্যায় হল সম্পত্তির উদয়।
9) রুশোর লেখা গ্রন্থের নাম কি?
উঃ বুশোর লেখা গ্রন্থের নাম 'সামাজিক চুক্তি', Emile প্রভৃতি।
10) রুশোর মতে সার্বভৌমিকতা কাকে বলে?
উঃ বুশোর মতে সার্বভৌমিকতা হল সাধারণ অভিপ্রায়ের রূপায়ন যা অ-হস্তান্তরযোগ এবং যৌথ সত্তা ব্যতীত কিছু নয়।
11) রুশোর সার্বভৌমের প্রকাশ কিভাবে হয় বলে উল্লেখ করেন?
উঃ বুশোর মতে সার্বভৌমের প্রকাশ কেবলমাত্র আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। সার্বভৌমের কেবল আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে।
12) রুশোর মতে আইন কি
13) রুশোর মতে কোন মানুষ ভাল?
উঃ বুশোর মতে স্বাভাবিক মানুষ (Natural Man) সভ্যতার ভণ্ডামির দ্বারা যে মানুষ আবিষ্ট হয় নি সেই মানুষ ভাল।
14) হবসে প্রাক্-রাষ্ট্রীয় সমাজ ও রুশোর প্রাক্-রাষ্ট্রীয় সমাজ সম্পর্কিত ব্যাখ্যার পার্থক্য কি? বা প্রাক্-রাষ্ট্রীয় সমাজ সম্পর্কে হবস ও বুশোর মধ্যে পার্থক্য কি?
উঃ প্রাক-রাষ্ট্রীয় সমাজ সম্পর্কে হবসের ধারনা হল সেই সমাজ ছিল দরিদ্র, নিঃসঙ্গ, ঘৃণ্য, পাশবিক সংকীর্ণ প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য সম্পৃক্ত, কিন্তু বুশোর বর্ণিত প্রাক্-রাষ্ট্রীয় সমাজ ছিল সুখী, স্বাভাবিক ও আনন্দময় প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য যুক্ত।
15) হবসের চুক্তি ও বুশোর চুক্তির মধ্যে পার্থক্য কি?
উঃ হবসের নিকট চুক্তি ছিল এক প্রকার শর্তহীন। মানুষ শর্তহীন ভাবে নিজেকে সার্বভৌমশক্তির নিকট সমর্পণ করেছিল। কিন্তু বুশোর চুক্তি ছিল মানুষের স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক মৌলিক শক্তির প্রতিষ্ঠানের উপর গুরুত্ব দেওয়া।
16) "মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু সে সর্বত্রই শৃঙ্খলাবদ্ধ"-উক্তিটি কার?
উঃ "মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু সে সর্বত্রই শৃঙ্খলাবদ্ধ"-উক্তিটি করেন জাঁ জ্যাক রুশো।
17) "Man is not born evil, but grows into it as the result of wrong art"-উক্তিটি কার?
উঃ "Man is not born evil, but grows into it as the result of wrong art"-উক্তিটি করেন জ্যা জাঁক রুশো।
18) রুশোর মতে মানুষের মধ্যে কয়প্রকার 'ইচ্ছা' রয়েছে?
উঃ বুশোর মতে মানুষের মধ্যে দুই প্রকার ইচ্ছা রয়েছে যথা 'প্রকৃত ইচ্ছা' ও 'অপ্রকৃত ইচ্ছা' বা 'বাস্তব ইচ্ছা'।
19) রুশোর মতে 'প্রকৃত ইচ্ছা' কাকে বলে?
উঃ রুশোর মতে প্রকৃত ইচ্ছা যা সাধারণের স্বার্থ পূরণ করে, মহৎ ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে সমষ্টির ইচ্ছাকে প্রকাশ করে।
.jpg)
0 মন্তব্যসমূহ