ভূমিকম্পের কারণ ও ফলাফল গুলি আলোচনা করো | Discuss the causes and consequences of earthquakes

ভূমিকম্পের কারণ ও ফলাফল গুলি আলোচনা করো  | Discuss the causes and consequences of earthquakes

আজকে আমরা জানবো ভূমিকম্পে কাকে বলে। ভূ অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের জন্য শক্তির সঞ্চয় ঘটে। এই শক্তির হঠাৎ মুক্তি ঘটলে ভূপৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয়। এরপ ক্ষণস্থায়ী এবং হঠাৎ কম্পনকে ভূমিকম্প বলে ।

ভূমিকম্পের সম্পর্কে কিছু বিষয় আলোচনা করা হবে। 

১ ভূমিকম্পের কেন্দ্র -  পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেখানে ভূমিকম্প তরঙ্গ উৎপন্ন হয় তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বলে। এই কেন্দ্র থেকে কম্পন ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গের মাধ্যমে সব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এবং এখানে ভূমিকম্পের কেন্দ্র চ্যুতি রেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়।  

আরও একটা জানবার বিষয় আছে ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০০ কিলোমিটার মধ্যে ভূমিকম্পের কেন্দ্র অবস্থান করে।

২ ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র-  ভূমিকম্প কেন্দ্রের ঠিক ওপরে ভূপৃষ্ঠ যে বিন্দুতে এই তরঙ্গে প্রথম পৌঁছায় সেই বিন্দুকে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র বলা হয়। উপকেন্দ্রে ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি প্রথম অনুভব করা যায় । এবং এর নিকটবর্তী অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় ।

৩ সমতীব্রতা রেখা - ভূমিকম্পের সমান তীব্রতা বিশিষ্ট স্থান গুলি কে মানচিত্রে যোগ করলে যে রেখা পাওয়া যায় তাকে সমতীব্রতা রেখা বলে। 


মার্সেলি স্কেলের সাহায্যে ভূমিকম্পের তীব্রতা মাপা যায়
এবং রিখটার স্কেলের সাহায্যে ভূমিকম্পের মাত্রা মাপা হয়।



ভূমিকম্পের কারণ এবং কারণগুলি কি কি । 

ভূমিকম্প বিভিন্ন কারণে ঘটে । কিন্তু সাধারণত আমরা এই কারণগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করি। 
1 প্রাকৃতিক কারণ
2 কৃত্রিম কারণ 

প্রাকৃতিক কারণ :-  ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক কারণ  আবার দুইটি ভাগে ভাগ করা হয় । 
1. ভূ-গাঠনিক 
2. অভূ-গাঠনিক


১) ভূ-গাঠনিক কারণ: 

(i) পাতের সঞ্চালনঃ পাত সংস্থান তত্ত্বের মাধ্যমে ভূমিকম্পের কারণ সবচেয়ে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। দেখা গেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প ঘটে পাত সীমানা (Plate boundary) বরাবর।

 (A) গঠনকারী পাত সীমান্তে দুটি পাত পরস্পর থেকে দূরে সরে গেলে ম্যাগমার উদগীরণ ঘটে এবং প্রবল চাপে ভূকম্প হয়। মধ্য আটলান্টিকে এইভাবে ভূকম্প ঘটে। 

(b) ধ্বংসাত্মক পাত সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পর কাছে চলে এলে কিংবা একটি পাতের নীচে আর-একটি পাত প্রবেশ করলে সংঘর্ষ ঘটে। ফলে, ভূ-আলোড়ন, চ্যুতি, অগ্ন্যুশ্চম ঘটে এবং ভূকম্প অনুভূত হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের উভয়দিকে ও আল্পস-হিমালয় অক্ষ বরাবর এই কারণেই ভূমিকম্প হয়।

 (c) নিরপেক্ষ পাত সীমানা বরাবর দুটি পাত পাশাপাশি সঞ্চরণশীল হলে শিলাস্তরে চ্যুতি ঘটে এবং প্রবল ভূকম্প অনুভূত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলে এই কারণেই ভূকম্প ঘটে। 

(ii) নবীন ভঙ্গিল পর্বতের উত্থান:  গিরিজনি আলোড়নের প্রভাবে প্রবল পার্শ্বচাপে পর্বতের উত্থান হয় এবং শিলাচ্যুতি ঘটে। ফলে ভূকম্প অনুভূত হয়। 

(iii) অগ্ন্যুৎপাত: ভূ-অভ্যন্তর থেকে প্রবল বেগে ম্যাগমা বেরিয়ে এলে, কিংবা গ্যাস ও বাষ্পরাশির প্রবল চাপে ভূমিকম্প হয়। 

(iv) ভূ-অভ্যন্তরের সংকোচন: জন্মের পর থেকেই ভূ-অভ্যন্তর তাপ বিকিরণ করে ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে শিলাস্তরের ওপর টান ও পীড়নের সহনশীল মাত্রা অতিক্রম করলে ভূমিকম্প ঘটে। 

(v) সমস্থিতিক ভারসাম্য: পৃথিবীর উপরিভাগের হালকা সায়াল (Sial) অপেক্ষাকৃত ভারীসায়মা (Sima) স্তরের ওপর ভারসাম্য অবস্থায় আছে। এই ভারসাম্যের ব্যাঘাত ঘটলেই ভূকম্পন অনুভূত হয়। ১৯৪৯ সালে লাহোরের ভূকম্প এই কারণেই ঘটেছিল। 

(vi) স্থিতিস্থাপক প্রত্যাঘাত (Elastic rebound): H. F. Reid (মার্কিন ভূতত্ত্ববিদ) এর মত অনুসারে পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে ওঠা চাপের কারণে ভূ-পৃষ্ঠের শিলাস্তরে বাঁকের সৃষ্টি হয়। চাপ প্রতিরোধক্ষমতার সীমা অতিক্রম করলে শিলায় ভাঙন ধরে এবং প্রবল শক্তি নির্গত হয়। ফলে, ভূ-কম্পন অনুভূত হয়।

(২) অভূ-গাঠনিক কারণ:

 (i) ভূগর্ভে ধস: ভৌম জলের ক্রিয়ায় দ্রবীভবনের ফলে ভূগর্ভে বড়ো বড়ো গহ্বর সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে গুহার ছাদ ধসে পড়লে স্থানীয় ভাবে ভূমিকম্প ঘটে। কাস্ট (Karst) অঞ্চলে মাঝে মাঝে এভাবেই ভূকম্পন ঘটে।

 (ii) পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস, হিমানী সম্প্রপাত, শিলাপতন ঘটলে মৃদু ভূকম্প ঘটতে পারে। 

(iii) উল্কাপাত: বৃহৎ উল্কাখণ্ড ভূপৃষ্ঠে সজোরে আছড়ে পড়লে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে।

(খ) কৃত্রিম কারণ: 

মানুষের বিভিন্ন কার্যাবলির প্রভাবেও ভূপৃষ্ঠে ভূমিকম্প ঘটে-


(১) জলাধার নির্মাণ: নদীতে বাঁধ দিয়ে জলাধার নির্মাণ করলে জলাধারের জলরাশির প্রবল চাপে ওই অঞ্চলে শিলা স্তরের সমস্থিতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে ভূমিকম্পের উদ্ভব ঘটে। ১৯৩৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা প্রদেশে মিয়ার হ্রদে হুভার বাঁধ নির্মাণের ফলে পরবর্তী দশ বছরে ওই অঞ্চলে প্রায় ৬০০ বার ভূমিকম্প ঘটে। একই কারণে মহারাষ্ট্রে কয়না বাঁধ নির্মাণের ফলে ১৯৬৭ সালে ১০ ই ডিসেম্বর ঐ অঞ্চলে প্রবল ভূমিকম্প হয়। 

(২) পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ: পরীক্ষানিরীক্ষার কারণে ভূগর্ভে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। প্রবল বিস্ফোরণে ওই অঞ্চলে ভূমিকম্প ঘটে। রাজস্থানের পোখরাণে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে ওই অঞ্চলের অসংখ্য বাড়িতে ফাটলের সৃষ্টি হয়। 

(৩) খনিজ অনুসন্ধান, রাস্তাঘাট নির্মাণ প্রভৃতি কারণে ডিনামাইট বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ফলে মৃদু ভূকম্পের উৎপত্তি ঘটে। 

(৪) ভূগর্ভ থেকে ভৌমজল, খনিজ তেল ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ আহরণে গহ্বরের

ভূমিকম্পের ফলাফল:

(১) ভূমিকম্পের ফলে ওই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠনের পরিবর্তন ঘটে। শিলাস্তরে ফাটল ও চ্যুতির সৃষ্টি হয়। স্তূপ পর্বত ও গ্রস্ত উপত্যকার সৃষ্টি হয়। মাঝে মাঝে বিদার অগ্ন্যুদ্গমের মাধ্যমে ম্যাগমা বেরিয়ে আসে। শিলায় ভাঁজ পড়ে ভঙ্গিল পর্বত গঠিত হয়। 

(২) ভূমিকম্পের প্রভাবে ভূমিরূপের উত্থান ও নিমজ্জন ঘটে। সমুদ্র তলদেশ থেকে কোনো অঞ্চল উত্থিত হয়ে উপকূল গঠিত হয়। আবার কোনো অংশ অবনমিত হয়ে হ্রদ ও জলাশয়ের সৃষ্টি করে।

(৩) ভূমিকম্পের প্রভাবে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে। নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হতে পারে, আবার নতুন নদীর সৃষ্টি হতে পারে।

(৪) ভূমিকম্পের ফলে ভৌমজলের প্রবাহ বিঘ্নিত হয়। 

(৫) ভূমিকম্পের প্রভাবে পার্বত্য অঞ্চলে শিলায় ধস নামে। শিলাস্তরের স্খলন ঘটে। 

(৬) ভূমিকম্পের ফলে উপকূল অঞ্চলে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। জাপানি ভাষায় এটি সুনামি নামে পরিচিত।

 (৭) ভূমিকম্পের ফলে ঘর-বাড়ি, শহর ধ্বংস হয়। মানুষ, গবাদিপশু মারা যায়। সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ